‘বাংলা প্রযুক্তি বিভ্রমের দায় ইউনিকোডের’

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ০১:১৭  
ইউনিকোডে বাংলা লিপি ঢ-ঢ়, ড-ড়, য-য়-তে সমস্যা থাকাতে বড় তথ্য (Big Data) বিশ্লেষণ, সার্চ ইঞ্জিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় এবং ইন্টারনেট অব থিংসে বেশ সংকট দেখা দিচ্ছে। মুদ্রণ জগতে ইংলিশ লিপির সাথে বাংলা লিপি’র সাইজের ক্ষেত্রে তারতম্য। বিভিন্ন বাংলা সফটওয়্যার ব্যবাহারে বাংলা লিপিতে ঁ চন্দ্রবিন্দু ক্ষেত্রে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। যুক্তাঅক্ষরের ক্ষেত্রে সমস্যাটা প্রকট। বাংলা ডাটা মাইনিং এখনো ইন্ডাষ্ট্রির সমতুল্য হয় নাই। ল্যাংগুয়েজ মডেল করতে দেখা যাচ্ছে বাংলা করপাসে বেশ সমস্যা। বাংলা লিপি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি মানসম্পন্ন নীতি থাকা দরকার। বাংলা লিপি নিয়ে এডহক ভিত্তিতে কাজ না করে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন ভাষা প্রযুক্তি প্রেমীরা। বুধবার রাতে ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলা লিপি ব্যবহারের সংকট ও সমাধান নিয়ে অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে দেয়া বক্তব্যে এই দাবি জানানো হয়। প্রযুক্তি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা কমপিউটার জগৎ এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজয় বাংলা’র রূপকার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাযুক্তিক সমস্যাটার পেছনে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, ‘তারা আমাদের ভাষা-কে এমন জটিল অবস্থায় করেছে- এবং এটি একটি স্বতন্ত্র্য ভাষা হিসেবে গণ্য না করে তারা আমাদেরকে বে নাগরীর অনুসারী করে যে প্রচণ্ড রকম ক্ষতি করেছে, আমার কাছে মনে হয় যে বাঙালীদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এই জন্যই এখনো আমাদের নোক্তা নিয়ে যুদ্ধ করে বেড়াতে হচ্ছে। অথচ বংলা বর্ণে কোনে নোক্তা নেই।.. ইউনিকোড যদি বাংলা-কে বাংলার মতো দেখে এই সমস্যাগুলো সমাধান করে ফেলতো তাহলে যে সমস্যাগুলো এখন ফেস করতে হচ্ছে তা করতাম না।’ এর দায় প্রতিবেশী দেশ ভারতেরও রয়েছে বলেও মনে করেন মোস্তাফা জব্বার। সে জন্য ভারত থেকে অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়া এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের, কলা অনুষদ ডিন এবং ভাষা বিজ্ঞান চেয়ার, অধ্যাপক উদয় নারায়ন সিং-কে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘দেরি করে হলেও বাংলাদেশ ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে যোগ দিয়েছে ২০১০ সালে। তার আগে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে ভারতীয় ভাষা পরিবারের যে এনকোডিংগুলো করা হয় তখন আমাদের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, সেই খান থেকে কোনো ধরনের কথা বার্তা বলা হয় নি। এটি দেবনাগড়ির অনুসরণ করে যেভাবে কোডিং করা হয়েছে এটাকে কিন্তু আলাদা ভাষা না কইরা দেবনাগড়ির একটি ভাষা হিসেবে করার ফলে আজকে আমরা এই সমস্যাগুলোতে দারুণ ভাবে ভূগছি।’ এসময় প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আসকি,ইউনি এবং প্রমিতের নির্দিষ্ট মান থাকলেও তার প্রয়োগ না থাকায় স্পেল চেকার, অভিধান, ওসিআর ইত্যাদিসহ বাংলা এনএলপি ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এর প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ‘বাংলা সফটওয়্যারই আমার জীবিকা’ গর্বের সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে তিনি আরো বলেন, ‘আসকি ও ইউনকোডের মধ্যে যে দেওয়াল আছে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তারপরও ইউনিকোড কনভার্সনে যে জটিলতা হয় তার অপরাধ বাংলা ভাষাভাষীদের নয়; এই অপরাধ ইউনিকোডের। তাই এখনো আমরা ইউনিকোডের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরাই তাদের মেধা-মনন দিয়ে এই যুদ্ধ জয় করবে।’ কমপিউটার জগৎ-এর নির্বাহী সম্পাদক, মোহাম্মদ আব্দুল হক অনুর সঞ্চালনায় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত এই নীতি সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ভাষা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, পরামর্শক মোহাম্মদ মামুন অর রশিদ। আলোচনার পর প্রশ্নত্তর পর্বে তিনি জানান, খুব শিগগিরই বাংলা বানান সংশোধনী সফটওয়্যার প্রকাশ করবে বিসিসি। আলোচনায় ভারত থেকে অংশ নেন এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের, কলা অনুষদ ডিন এবং ভাষা বিজ্ঞান চেয়ার, অধ্যাপক উদয় নারায়ন সিং। তিনি বলেন, ‘বাংলালিপির সঙ্গে একটা অদ্ভূতি আত্মিক যোগাযোগ আছে। এটা এতো বেশি যে কোনো রকম পরিবর্তনের কথা বলতে গেলেই নানা রকম সমস্যার দেখা দেয়। এটা নিয়ে আমরা পাঁচ পা এগিয়ে চার পা পিছিয়ে যাচ্ছি।.. এ কারণে এই ভাষাকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।’ ওয়েবিনারে মনোনীত আলোচক হিসাবে আরো বক্তব্য রাখেন অসংখ্য ডেটা সায়েন্স বইয়ের লেখক রাকিবুল হাসান, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিপা জাহান।